ফোর মার্ডার: সাত বছর পরও বিচার মেলেনি উখিয়ার সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের
বিশেষ প্রতিবেদন:
সময় নদীর মতো প্রবাহিত হয়, আর সেই স্রোতে কত স্মৃতি যে স্তব্ধ হয়ে যায়, তার হিসেব রাখা দায়। তবে কিছু স্মৃতি এত রক্তাক্ত এবং কিছু ইতিহাস এত বেদনার যে, সময়ের ধুলোবালিও তা মুছে দিতে পারে না—অন্তত দেওয়ার কথা নয়।
কিন্তু আমরা কি সত্যিই ভুলে গেলাম ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের সেই ভয়াল রজনীকে?
উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং ইউনিয়নের পূর্ব রত্নাপালং গ্রাম। পাহাড়ি নিস্তব্ধতায় ঘেরা শান্ত এক জনপদ। ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সেই শান্ত গ্রামটি নিমেষেই রূপ নিয়েছিল এক মহা শ্মশানে। রাতের আঁধারে একই পরিবারের চারজন নিরপরাধ মানুষকে গলা কেটে নৃসংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ঘাতকের ধারালো অস্ত্রের নির্মম শিকার হয়েছিলেন সখি বালা বড়ুয়া (৬৫), তাঁর পুত্রবধূ মিলা বড়ুয়া (২৫), নাতি রবিন বড়ুয়া (৫) এবং নাতনি সনি বড়ুয়া (৬)।
এক রাতে, একই ছাদের নিচে নিভে গিয়েছিল তিনটি প্রজন্মের প্রদীপ। স্বজনহারা রোকেন বড়ুয়া হারিয়েছিলেন তাঁর জন্মদাত্রী মা, সহধর্মিণী এবং কোলের একমাত্র সন্তানকে। আর সেই রাতে কাকতালীয়ভাবে সেই ঘরে ঘুমাতে আসা ছোট্ট ভাতিজি সনি বড়ুয়ারও জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল অমানবিক নিষ্ঠুরতায়। কোমলমতি দুই শিশুর রক্তে ভেসে গিয়েছিল সেই ঘরের মেঝে।
আজ দেখতে দেখতে প্রায় সাতটি বছর কেটে যেতে চলল। কিন্তু উখিয়ার বহুল আলোচিত সেই ‘ফোর মার্ডার’-এর রহস্যের জট কি আজও খুলেছে?
ঘটনার পর পর আইনের নানা সংস্থা তদন্তে নেমেছিল, আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল দ্রুত বিচার ও অপরাধিদের চিহ্নিত করার। সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে কয়েকদিন ধরে সেই রক্তভেজা ছবি আর স্বজনদের আর্তনাদ জায়গা করে নিয়েছিল।
কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, তদন্তের ধীরগতি এবং রহস্যের কুয়াশা ততই ঘন হয়েছে। অপরাধীরা অধরাই থেকে গেছে, নাকি তদন্তের টেবিলে ফাইলের নিচে চাপা পড়ে গেছে চার-চারটি তরতাজা প্রাণের অকালমৃত্যুর ন্যায়বিচার?
একজন মা, একজন স্ত্রী আর দুটি নিষ্পাপ শিশুর রক্তাক্ত মুখগুলো কি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না? অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, বরং পুরো সমাজের নিরাপত্তাহীনতার এক নীরব দলিল।
সাত বছর পর আজ যখন আমরা আবার পিছন ফিরে তাকাই, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি তবে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই মেনে নিয়েছি? পূর্ব রত্নাপালং গ্রামের সেই রক্তভেজা রাতের বিচার না হওয়া পর্যন্ত উখিয়াবাসী তথা ন্যায়বিচারকামী প্রতিটি মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ হতে পারে না। বিচারকাজে গতি ফেরানো এবং মূল পরিকল্পনাকারী ও ঘাতকদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। নিভে যাওয়া প্রাণগুলোর আত্মা যেন অন্তত ন্যায়বিচারের শান্তিতে একটু জিরোতে পারে।
সূত্র:প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু
মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো * চিহ্নিত।